একাত্তরতম অধ্যায় আমাদের এখানে যে নিয়ম
পরবর্তী ক’দিন ধরে আমি নিয়মিত সময়মতো মৃতদেহঘরে কাজে যাচ্ছিলাম—তবে প্রতিবারই দেয়াল ডিঙিয়ে ঢুকতে হতো। শালিক বলেছিল, আমাদের মৃতদেহঘরের প্রধান ফটক কেবল রাতে খোলা হয়, কারণ তখনই গ্রাহক আসে। প্রথম দিন রাতে, ঝাং হুইফাংয়ের স্বামী এসেছিলেন, স্ত্রীর সাজসজ্জা দেখে খুবই খুশি হয়েছিলেন। সেদিন রাতেই ঝাং হুইফাংয়ের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল দাহঘরে।
এখানকার দাহঘর—যা সবাই 'মানুষ পোড়ানোর ঘর' বলে—সাধারণত কালোচুলই তা দেখাশোনা করে। কৌতূহলবশত আমি শালিককে জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের এই বিশেষ ব্যবসা থেকে কত আয় হয়। শালিক চার আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘‘চার লাখ, এ কাজটা তুলনামূলক কঠিন, তাই সাধারণ কাজের চেয়ে দাম বেশি।’’
আমি চমকে উঠলাম—একটা কাজেই চার লাখ টাকা! আগে যখন আমি কাকাকে নিয়ে শবঘরে যেতাম, তখন তো বছরজুড়ে মৃতদেহঘরের সঙ্গে ওঠাবসা ছিল, ভালোই জানতাম এখানকার দামের হিসাব। এই চার লাখ দিয়ে সাধারণ মৃতদেহঘরের কতগুলো কাজ হয়ে যেত কে জানে!
‘‘তাহলে সাধারণত কত নেয়া হয়?’’
শালিক একটু ভেবে বলল, ‘‘দুই-তিন লাখের মতো। আর দুই লাখের কম হলে আমরা নিই না।’’
আমি অবাক হয়ে বললাম, এ তো চরম বেশি—প্রায় ডাকাতির মতো! শালিক ঠোঁট উঁচিয়ে বলল, ‘‘ওরা দুই-তিন লাখ, চার-পাঁচ লাখ খরচ করে বাড়িঘর শান্ত রাখতে পারে, সেটাই তো লাভের। তুমি এই ক’দিনে যে ক’টা মৃতদেহ দেখেছ, বলো তো, চিরসুখের মতো সাধারণ মৃতদেহঘর কি এসব সামলাতে পারত?’’
শুনে আমার বুক কেঁপে উঠল—ভেবে দেখি, সত্যিই এই ক’দিনের মৃতদেহগুলো সবই ভেতরে বড় রহস্য লুকিয়ে রেখেছে। সেই গলাকাটা লোকটা হোক, না-হয় গর্ভে সাপ নিয়ে আসা ঝাং হুইফাং, এমনকি বুকের মাঝখানে লোহার খিল ঠোকা ছেলেটি—কোনোটাই স্বাভাবিক নয়।
শালিক একবার আমায় দেখে বলল, ‘‘আমি শুনেছি, বড়দা বলেছেন, তুই মন্দ কাজ করিসনি, এমনকি দিদি পর্যন্ত কোনো দোষ খুঁজে পায়নি। কিন্তু, তুই একটা ভুল করেছিস।’’
আমি চমকে উঠে মনেপ্রাণে সব কাজের খুঁটিনাটি স্মরণ করলাম—কোথাও তো ভুল মনে পড়ল না। শালিক হাসল, ‘‘তুই কি ঝাং হুইফাংয়ের পেট সেলাই করেছিলি?’’
আমি বললাম, হ্যাঁ—ওই মহিলার পেট কাটা ছিল তো, সেলাই না করে উপায় কী! কথা শেষ করতে করতেই হঠাৎ মনে পড়ল, ‘‘ওর পেট!’’
ওই নারী যখন স্বামী এনেছিলেন, তখন গর্ভবতী ছিলেন। পরে চিকনদেহী সাপের ভ্রূণ বের করে দেয়, আমি সরাসরি পেট সেলাই করে দিই। স্বামী এসে দেখলেই তো বুঝে যাবে কিছু একটা গড়বড়! আসলে ভুল করেছি—সেলাইয়ের আগে তুলা কিংবা কাপড় ভরাট করা উচিত ছিল।
শালিক বলল, ‘‘তুই কি মনে করতে পারিস, দিদি কি নিজে এসে দেখেনি, তবু কিছু বলেনি?’’
ভেবে দেখি, সত্যিই তো—দিদি এসে দেখেছিলেন, কিছু বলেননি।
‘‘এই তো হলো। দিদি কিছু বলেনি কারণ, তুই তুলা দিস বা না-দিস, তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ ওই ঝাং হুইফাংয়ের স্বামী জানতই গর্ভের সন্তান নিয়ে সমস্যা আছে, তাই তো এখানে পাঠিয়েছিল।’’
এ কথা শুনে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। আসলে এই রোংহুয়া শবঘর টিকে আছে কারণ বিশেষ ধরনের কাজ নেয়। কাজ কম হলেও বাদবাকি শবঘরের মাসের ব্যবসার চেয়ে অনেক বেশি আয় হয়—তিন বছর একবার কাজ, সেই আয়ে তিন বছর চলে যায়—এটাই তো কথা।
এতে মন্দ কিছু নেই; যখন কাজ নেই, তখন আরাম, আর মজুরি তো ঠিকই পাওয়া যায়।
সেদিন সকালে আমি সদ্যই লোহা-গেট ডিঙিয়ে ঢুকেছি, ঠিক তখনই শবসজ্জা কক্ষে যাব, এমন সময় সামনে শালিককে দেখি—চুলে গোলাপি ফিতে বাঁধা, গায়ে কালো-সাদা চেকের ছোট স্কার্ট, উজ্জ্বল সাদা মাংসল পা বেরিয়ে আছে, পায়ে গাঢ় লাল স্যান্ডেল। শালিকের বয়স তো ত্রিশের ওপর, কিন্তু পোশাক দেখে মনে হয় যেন সতেরো-আঠারো বছরের মেয়ে। আমি এলে স্কার্ট তুলে বলল, ‘‘কী, দিদির পোশাক কেমন?’’
আমি বললাম, ‘‘দারুণ, কিন্তু আমাদের শবঘরে এত রঙিন পোশাক, একটু তো বেমানান লাগে।’’ শবঘর তো জীবিত আর মৃতের সীমারেখা—এখানে গাম্ভীর্য চাই, এই রঙচঙে পোশাক একদম বেমানান।
শালিক আমার মাথায় চাঁটি কেটে বলল, ‘‘আমি খুশি হলেই হলো!’’
আমি মাথা চেপে ধরে ভাবলাম, মেয়েরা বোধহয় এমনই—নিজেদের আনন্দটাই বড়। তবে আজ শালিক এত সকালে উঠেছে দেখে একটু অবাক হলাম, বললাম, ‘‘আজ ঘুমাসনি?’’
শালিক চোখ টিপে বলল, ‘‘কেন, আমার সঙ্গে ঘুমাতে চাস? কাল একটু আগে আয়, তবে আজ না—আজ বড়দা-ওরা সবাই সামনের ঘরে গেছে, আমরাও যেতে হবে।’’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘‘কী হয়েছে?’’
শালিক মুখ গম্ভীর করে বলল, ‘‘কেউ নিয়ম ভেঙেছে, দিনের বেলায় লাশ নিয়ে এসেছে!’’
আমি হতবাক—আমাদের এখানে তো পরিচিত মধ্যস্থতাকারীরাই কাস্টমার নিয়ে আসে, সবাই বহুদিনের চেনা, নিয়ম জানে। তাহলে এমন হলো কেন?
শালিকের পেছন পেছন ঘুরে কয়েকটা ঘর পেরিয়ে আমরা পৌঁছালাম সামনের অতিথিকক্ষে। এ ঘরটি অন্য ঘরগুলোর চেয়ে অনেক বড়, দু’তলা। আমরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলাম, দেখি ভেতরে সোফা, চা-টেবিল, এমনকি পুরনো টিভিও আছে—কবে থেকে আছে কে জানে, চলে কিনা তাও সন্দেহ।
মা-বড়দা, কালোচুল, পেশিবহুল ছেলেটা আর চিকনদেহী সবাই ভেতরে। চিকনদেহী আগের মতোই—লম্বা হাত-পা, কাঠের মতো দাঁড়িয়ে, মুখে কোনো ভাব নেই। কালোচুল দু’জনের সঙ্গে কথা বলছে, তর্কাতর্কি চলছে মনে হয়। পেশিবহুল লোকটা একপাশে দাঁড়িয়ে, গায়ে সরল হাসি, কিছু বলছে না।
মা-বড়দা সোফায় বসে চা খাচ্ছে, মুখে গম্ভীর ছায়া। তার সামনের সোফায় দু’জন বসে—একজন তিরিশের ঘরে, খাটো-স্থূল, মাথায় পাতলা হলুদ চুল, ছোট নাক-চোখ, মুখখানা বেশ হাস্যকর, হাসি মুখে তোষামোদ করছে। তার পাশে বসা তরুণটি কুড়ি-একুশ বছরের বেশি নয়, মুখ দুধে-আলতা, ঠোঁটে হালকা গোঁফ, মুখে গাম্ভীর্য, চোখ বুজে সোজা হয়ে বসে।
আমি দেখে মজাই পেলাম—ছেলেটা ছোট হলেও কেমন মুখ শক্ত করে বড়দের মতো ভাব ধরেছে।
আবার দেখি, কালোচুলের সঙ্গে তর্ক করছে যে দু’জন—একজন মধ্যবয়সী, মুখে বিবর্ণ ভাব, কপালে ঘাম, পোশাকে বেশ ধনী মনে হয়। আরেকজন বেশ চাকচিক্যপূর্ণ এক নারী, মরিয়া হয়ে কালোচুলের বাহু আঁকড়ে ধরে কাঁদছে, প্রায় হাঁটু গেড়ে পড়ার মতো।
আমাদের দেখে মা-বড়দা ভ্রু-জোড়া খুলে কিছুটা হাসল, আমায় মাথা নেড়ে অভ্যর্থনা করল।
আমি পেশিবহুল ছেলেটাকে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘‘এরা কারা?’’
সে আস্তে বলল, ‘‘ওই দু’জন মরার আত্মীয়—একজন বাবা, আর মহিলা... বলে ওই ছেলের সৎমা।’’ কালোচুলের সঙ্গে যারা তর্ক করছে, তাদের দেখিয়ে বলল।
আমি ওদের দেখে বললাম, ‘‘মহিলা তো বেশ কাঁদছে, মনে হয় ভালই সৎমা।’’
আমাদের গ্রামে এক সহপাঠিনী ছিল সৎমায়ের হাতে বড় হওয়া, তার জীবন বড়ই করুণ ছিল। এ মহিলা অন্তত মন থেকে কাঁদছে মনে হয়।
পেশিবহুল লোকটা হাসল, ‘‘ধুর, ওর কান্না ছেলেটার জন্য নয়, নিজের জন্য।’’
আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘‘কেন?’’
সে বলল, ‘‘কৌতূহল থাকলে ছেলেটার মৃতদেহ দেখে আয়।’’
এ কথা শুনে বুঝলাম, নিশ্চয়ই ছেলেটার দেহে কিছু রহস্য আছে। মৃতদেহ নিয়ে ব্যাপার হলে আমার কৌতূহল আরও বেড়ে গেল, বললাম, কোথায়?
সে পূর্ব কোণার দিকে এক বিশাল লোহার বাক্স দেখিয়ে বলল, ওখানেই।
শালিক মনে হয় ঘুমিয়ে ক্লান্ত, বারবার হাই তুলছে, মৃতদেহ দেখার প্রতি কোনো আগ্রহ নেই। আমি একাই এগিয়ে গেলাম। বাক্সটি প্রায় এক মিটার লম্বা, আধা মিটার চওড়া, বেশ পুরু ও মজবুত। ঢাকনাটি খোলা, ভেতরে উঁকি দিলাম—একটি ছোট ছেলের দেহ পড়ে আছে।
বয়স আন্দাজ চার-পাঁচ, মুখে কালচে ছাপ, ঠোঁট নীল, দেহে কালো দাগ। প্রথমে দেখে মনে হবে কিছুই নেই, কিন্তু ভালো করে তাকাতেই অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলো।