চতুরাত্তর অধ্যায়: মুখ খুলে বলা

সমুদ্রের দস্যু ও বিপর্যয় বেগুনি-নীল রঙের শূকর 2811শব্দ 2026-03-19 08:41:51

এই সময়টা জুড়ে, মড প্রতিদিনই শহরে গিয়ে শিকার খুঁজত। পাঁচ দিনের শেষে, সব মিলিয়ে পনেরোটা লক্ষ্যে শিকার করেছে সে, অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন তিনটা করে। শারীরিক ক্ষমতার উন্নতি খুব ধীরগতিতে হচ্ছে, মনে হয় দ্বিতীয় তারকাচিহ্ন পেতে এখনো অনেকটা পথ বাকি। তবে তরবারি বিদ্যায় তার অগ্রগতি বেশ দ্রুত, কারণ মড ইচ্ছাকৃতভাবে তরবারি চালানো শিকারদের দিকেই মনোযোগ দিয়েছে। অনুমান করা যায়, বেশি সময় লাগবে না, তরবারি বিদ্যায় প্রথম তারকাচিহ্ন অর্জন করতে পারবে সে।

চার লক্ষ পঞ্চাশ হাজার বেলির গোয়েন্দা খরচ মাত্র তিন দিনেই জোগাড় করেছিল মড। তারপর সে সরাসরি নিশীথ পানশালায় গিয়ে টাটামুকে তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়। এরপরের দু’দিনে আরও প্রায় দেড় লক্ষ বেলি আয় করে মড। বলতে গেলে, যেসব জলদস্যুর মাথার দাম নির্ধারিত হয়েছে, তাদের কাছে কমবেশি কিছু টাকা থাকেই।

সেই দিন সন্ধ্যায়, সল দোকানে ফিরে আসে, সঙ্গে নিয়ে আসে বেসমেন্টে আবারও পিপে ভর্তি মদের স্তূপ। স্বল্প সময়ের মধ্যে, লালচুলও আর মদ ‘ছিনিয়ে’ নিতে আসবে না, আর এই মদ সল একা নতুন বছর পর্যন্ত খেতে পারবে। সলের সঙ্গে দীর্ঘদিন পর দোকানে ফিরে আসে আর্থারও।

‘‘আজ আমি ছুটিতে,’’ মুখোশ খুলে, সাধারণ পোশাকে আর্থার জানায় কেন সে দোকানে এসেছিল। আসলে, তার আগ পর্যন্ত কেউ তাকে এই প্রশ্ন করেনি।

আর্থার কাউন্টারে হেলান দিয়ে সানির সঙ্গে নিষ্প্রভ আলাপে মেতে ওঠে। সানি মনোযোগ দিয়েছে পত্রিকায়, কিন্তু আর্থার তা গা করে না, সানি দুই-চার বাক্য উত্তর না দিলেও সে নিজের কথাতেই মগ্ন। পাশে, মড মন দিয়ে আর্থারের মুখচ্ছবি মনে রাখে, ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি হিসেবে। এ এক বিরল সুযোগ, কারণ সাধারণত শবব্যবস্থাপকরা মুখোশ পরে থাকে, তাদের আসল চেহারা দেখা দুষ্কর।

‘‘ওহ, ঠিক আছে,’’ আচমকা রহস্যময় হাসি ছড়িয়ে আর্থার বলে ওঠে। সানি একটু থেমে কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকায়। আর্থার গলা নিচু করে ফিসফিস করে, ‘‘শুয়োরের খামারে গত রাতে একটা মজার ঘটনা ঘটেছে, জানতে চাও?’’

‘‘কোনো আগ্রহ নেই,’’ সানির চাহনি হঠাৎই শীতল হয়ে ওঠে।

আর্থার কাঁধ ঝাঁকিয়ে গম্ভীরভাবে বলে, ‘‘সানি, শক্তিশালী হতে চাইলে অতীতকে সম্মুখীন হতে হবে, তবেই ভবিষ্যতের মুখোমুখি হওয়া যায়। অথচ, যখনই শুয়োরের খামারের কথা বলি, তোমার প্রতিক্রিয়া এতটা স্পষ্ট হয়—এটা কিন্তু দুর্বলতা।’’

‘‘এটা তোমার বিষয় নয়,’’ সানির মুখাবয়বে উদাসীনতা।

আর্থার হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ‘‘আমি তো তোমার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করতে চাইছি,’’ বলে। বারবার ক্ষতচিহ্ন উন্মোচিত হওয়ায় সানি আর কোনো কথা বলে না, বরং তার দৃষ্টিতে আরও শীতল বিরক্তি ফুটে ওঠে।

এই দৃশ্য দেখে আর্থার একরকম আক্ষেপ করে, ‘‘এ যুগে ভালো মানুষ হওয়া সত্যিই কঠিন।’’

এ সময়, মড চুপিসারে আর্থারের পাশে এসে নিরীহ হাসি ছড়িয়ে বলে, ‘‘আর্থার দাদা, আমি আপনাকে সবসময় শ্রদ্ধা করি।’’

‘‘ওহ?’’ আর্থার তাকিয়ে মৃদু হাসে, ‘‘ছোকরা, তোমার চোখ ভালো।’’

কাউন্টারের ভেতর থেকে সানি বিস্মিত হয়ে মডের আচরণ খেয়াল করে। মড গম্ভীর গলায় বলে, ‘‘আসলে, আর্থার দাদার পেশা আমাকে গভীর শ্রদ্ধায় অভিভূত করে।’’

‘‘হ্যাঁ? তাই নাকি?’’

এবার আর্থার একটু অস্বস্তি অনুভব করে। মড আবার বলে, ‘‘হ্যাঁ, তাই তো আমি ভাবি, কী এমন কারণ আপনাকে এত শ্রদ্ধেয় এক ঝাড়ুদার হতে উদ্বুদ্ধ করল?’’

আর্থার ভ্রু কুঁচকে চুপ করে যায়। শবব্যবস্থাপক পেশা এখানে পরিচিত, কেউ কেউ তাদের ‘পরিষ্কারকারী’ বলে, কেউ বা তাচ্ছিল্য করে ‘ঝাড়ুদার’ ডাকে। সত্যিই, তাদের কাজ ঝাড়ুদারের কাছাকাছি, তবে তাতে অবমূল্যায়ন হয়। তাই, কোনো শবব্যবস্থাপকই সরাসরি ‘ঝাড়ুদার’ ডাক শুনতে চায় না। আর্থারও তার ব্যতিক্রম নয়।

তবুও, মডের আন্তরিক শ্রদ্ধার চেহারা দেখে তাতে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায় না। আর্থার জানত না, ‘ঝাড়ুদার’ পেশাটা সত্যিই সম্মানের যোগ্য।

আর্থার চুপ থাকলেও মড থামে না। ‘‘আরও একটা ব্যাপার, সেলাই-ফোঁড়াই তো সাধারণত মেয়েরাই পারে, কিন্তু আমি দেখেছি দাদা, আপনি তো নিপুণভাবে সেলাই করেন—দেখে বিস্ময় জাগে।’’

‘‘হ্যাঁ, হ্যাঁ,’’ আর্থার কৃত্রিম হাসি দেয়।

ঠিক তখনই সল হাতে মদের কলসি নিয়ে বেরিয়ে আসে। আর্থার এগিয়ে তাকে থেকে মদ নিয়ে নেয়। আসলে, সে এসেছিলই সলের কাছ থেকে মদ কেনার জন্য। কলসি হাতে পেয়েই সে আর পেছনে তাকায় না, সোজা দোকান ছেড়ে বেরিয়ে যায়।

সানি চেয়ে দেখে আর্থারের প্রস্থান, তারপর মডের দিকে তাকায়, চোখে মৃদু হাসির রেখা। মড হেলান দিয়ে বলে, ‘‘সানি, তুমি তো সাধারণত খুব রুঢ়, আর আর্থারের সামনে কেন চুপচাপ হলে?’’

‘‘রুঢ়? আমি?’’ সানি অবাক হয়ে বলে, নিজেকে সে একেবারেই চিনতে পারে না।

‘‘হ্যাঁ!’’ মড দৃঢ়ভাবে বলে। পাশে, বেলি অজান্তেই মাথা নাড়ে, তারপর বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি সানির দিকে তাকায়। দেখে, সানি খেয়ালই করেনি, তখন সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।

‘‘ওহ,’’ সানি গা করেনা, শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করে ফের পত্রিকায় মন দেয়।

মড একটু হেসে ফেলে। সে আসলে আন্দাজ করতে পারে, অতীতের কোনো তিক্ত স্মৃতি থেকেই সানি আর্থারের এমন আচরণ সহ্য করতে পারে না। মড জানতে চাইলেও, জোর করলে সানির ক্ষত আরেকবার উন্মোচিত হবে, তাই চুপ থাকে।

রাতের খাবারের সময়, সল উদারভাবে এক পিপে মদ বের করে আনে। সদ্য মদ এনেছে বলে সে নির্দ্বিধায় খরচ করছে। এই মদের স্বাদও চমৎকার। লালচুল নিজে এসে যে মদ চেয়েছিল, তা তো বিশেষ কিছু হবেই। বুড়ো, দুই তরুণ আর এক মোটা কাঠবেড়ালি একসঙ্গে পান করতে করতে মুহূর্তেই এক পিপে মদ শেষ করে ফেলে।

‘‘তুই তো দেখি ভালোই মদ খেতে পারিস,’’ অবাক হয়ে সল টেবিলে অলস হয়ে শুয়ে থাকা বেলির দিকে তাকায়।

‘‘একটু পারি, হুঁক্ক!’’ বেলি হেঁচকি তুলে বলে।

এক সময় টেবিল জুড়ে মদের ঘ্রাণ আরও ঘন হয়ে ওঠে। সানি আবারও বেলির জন্য বড় বাটিতে মদ ঢেলে দেয়, বেলির ক্রমশ ফোলা পেটের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকায়।

‘‘হা হা!’’ সল হেসে উঠে আরও এক পিপে মদের জন্য প্রস্তুত হয়।

‘‘আজ, না মাতলে ছাড়ছি না!’’

‘‘চল!’’

সলের কথা শুনে বেলি সোজা হয়ে বসে, যেন আরও তিনশো বার লড়তে প্রস্তুত। এমন উল্লাসে মডও কিছুটা বেশিই পান করে ফেলে। এতে সে খানিকটা মাতাল হয়ে পড়ে, তবে সে মাথা ঘামায় না, আজ রাতে বাইরে পালানোর কোনো পরিকল্পনা নেই।

...................

এক সপ্তাহ পর।

মড নিশীথ পানশালায় গিয়ে টাটামুর কাছ থেকে দস্যু দলের কর্মকর্তাদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে। একই সঙ্গে, কোন সময় দস্যু দল পাগল টুপির শহরে আসতে পারে, সেই সময়ও পায়।

‘‘দশ দিন পরের নিলাম?’’ মড ভাবনায় ডুবে যায়।

দোকানে ফিরে মড সোজা নিজের ঘরে গিয়ে, শিকারি নোটবই বের করে কর্মকর্তা সংক্রান্ত সব তথ্য লিখে রাখে। বিস্তারিত তথ্যসহ তিনজন অফিসার স্তরের যোদ্ধা রয়েছে, আর নিচে আরও এগারো জন অধিনায়ক স্তরের লোক। এদের নাম একটাও বাদ না দিয়ে সে নোটে লিখে রাখে।

সবশেষে নিচে নেমে দোকানে আসে মড। সল আর সানি দু’জনেই আছে। সল পা পা তুলে একটা হলুদ বই পড়ছে মনোযোগ দিয়ে। সানি কাউন্টারের ভেতর বসে একটা চকমকি পিস্তল পুনর্গঠন করছে।

‘‘সল,’’ মড গম্ভীর গলায় ডাকে।

তার স্বর আগের চেয়ে ভিন্ন শুনে সল ও সানি প্রায় একসঙ্গে তাদের কাজ থামিয়ে মডের দিকে তাকায়।

দু’জনের দৃষ্টির সামনে মডের মুখ গম্ভীর।

‘‘আমি খুঁজে পেয়েছি... আমার পরিবারের বণিক জাহাজে হামলাকারীদের পরিচয়।’’

‘‘কি!?’’ সানির চোখে বিস্ময়।

সলের মুখ কিন্তু সম্পূর্ণ নির্বিকার।